বাংলাদেশে এক দিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ আর অন্যদিকে এর বিশাল অংশ শিক্ষিত অথচ বেকার। তবে তরুণ-তরুণীদের এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে আছে উদ্যোম, নতুন কিছু করে দেখানোর অদম্য স্পৃহা। তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকারও চায় প্রশিক্ষণ আর ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে বেকারত্বের সমাধান করতে, দেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সব থেকে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ‘উদ্যোক্তাবাদ’ বা ‘উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা’।

নিজের মেধা জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, উদ্ভাবনী শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আর ঝুকি নেবার অসীম সাহসকে পুঁজি করে যারা নতুন কিছু করতে চায় তাদের জন্য এক অসাধারণ বই ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ব্যবসায় নির্দেশনা’। বইয়ের লেখক ডক্টর সবুর খান। ড্যাফো্ডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বোর্ড অফ ট্রাস্ট্রিজ এর চেয়ারম্যান, ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিডিসিআই) এর সাবেক সভাপতি।

এই বইয়ে মোট অধ্যায় আছে ১০টি। প্রতিটি অধ্যায়ই নতুনত্বে ভরা। এখানে যেমন আছে তাত্বিক আলোচনা, সেই সাথে আছে ব্যবসার নানা দিক ও ঝুঁকি মোকাবিলা করার সহযোগী নানান পরামর্শ।

বইয়ের শুরুর অংশটি সাজানো হয়েছে ‘উদ্যোক্তাবাদ’ বিষয়ক আলোচনা আর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার জন্য কি কি বিষয়ে নজর দিতে হয় সে সম্পর্কিত আলোচনা নিয়ে। যে কোন ব্যবসা শুরু করা মানেই কিন্তু উদ্যোক্তা হয়ে যাওয়া নয়। এ জন্য এক ধরণের উদ্দীপনা থাকতে হয়, নতুন কিছু করার প্রেরণা নিয়ে পথ চলতে হয়, নতুনত্বকে প্রাধান্য দিয়ে মানুষের মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। উদ্যোক্তা হবার এমন সুত্রগুলোকে লেখক সহজ ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন শুরুর কয়েকটি অধ্যায়ে। বিষদ বর্ণনা করেছেন একজন উদ্যোক্তার ‘নেতৃত্বের গুণাবলী’ নিয়ে। ছোট ছোট পয়েন্ট আকারে একজন উদ্যোক্তাকে ভবিষ্যত দেখানোর জন্য ‘চোখ খোলার’ চেষ্টা করেছেন তিনি, যেন ব্যবসা শুরুর আগেই তার সামনের এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমা সে নিজে নিজে অনুভব করতে পারে। সে যেন দেখতে পারে সামনে পথ চলার সুবিধা-অসুবিধা গুলো, যেন ব্যবসায় নামার পর নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে অনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য।

দ্বিতীয় অংশে স্থান পেয়েছে একেবারে ব্যবহারিক আলোচনা। একজন নতুন উদ্যোক্তা ব্যবসায় নামার পর কঠিন বন্ধুর পথে চলতে গিয়ে যেসব বিষয় বুঝতে না পেরে খাবি খেয়ে এক পর্যায়ে হতাশায় নিমগ্ন হয়, সেসব বিষয় খুব সহজ, প্রাঞ্জল ভাষায় একের পর এক বর্ণনা করা হয়েছে। ধরে ধরে দেখানো হয়েছে কোথায় কোন কাজটি করতে হয়, কোন কাজটি কোনটির পর হয়, ‘এর পর কি’ সহ আরো নানান প্রশ্নের উত্তর মেলে এই অংশে। সেই সঙ্গে উপহার হিসেবে ব্যবসা সাজানোর নানান উপকরণ সংযুক্ত করা হয়েছে ‘বাজারজাত করণ ও গ্রাহক সংগ্রহ’ শিরোনামের অধ্যায়। ব্যবসার বাজার অনেক কঠিন একটি জায়গা। এখানে প্রতিযোগীতা করতে হয় ছোট-বড়-মাঝারী নানান রকম প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে। কৌশলই পারে এ প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে সহযোগীতা করতে। আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা সংযোজনের মাধ্যমে কিভাবে ব্যবসায় উদাহরণ তৈরী করা যায় তার প্রমাণ হাজির করেছে এ বই। আধুনিককালের বানিজ্যের ধারণা ও কৌশল কেমন হবে তার খুটিনাটি আয়নার মত পরিষ্কার করা হয়েছে এ অংশের শেষের দিকে।

উদ্যোক্তা যে কেউ হতে পারে, হতে চাইতেও পারে। কিন্তু অর্থ? অর্থের যোগান বা অর্থায়ন একটি মৌলিক বিষয়। তরুণরা নানা ধরণের ব্যবসার ধারণা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ঠিকই, কিন্তু অর্থের অভাবে কাজ শুরু করতে পারে না। এমনকি অনেকে জানেও না যে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও উত্তম পরিকল্পনায় অর্থায়নের জন্য বসে আছে বহু মানুষ ও প্রতিষ্ঠান। তথ্য না জানার এই অসুবিধা দূর করা সহ অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক নানান প্রশ্নের উত্তর নিয়ে হাজির হয়েছে এই বইয়ের তৃতীয় অংশ।

উদ্যোক্তা হতে ইচ্ছুক এমন প্রত্যেকেরই মাথায় কোন না কোন ব্যবসায়ীক পরিকল্পনা ঘুরপাক খায়। চিন্তার বৈচিত্র দিয়ে দুনিয়াকে চমকে দেবার বাসনা থাকে তার মধ্যে, থাকে যে কোন উপায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সবাইকে অবাক করে দেবার দুরন্তপনা। আর এই অতৃপ্ত উদ্যোমই হয়তো তাকে এ পথে ছুটতে সাহস যোগায়। তবে এ পথ কোন সহজসাধ্য পথ নয়। এ পথ বড়ই দুর্গম, বন্ধুর। কিছু দূর চলার পরেই নানান ঝড় ঝঞ্ঝা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, নানান ভয় তাকে আঁকড়ে ধরে, নানান বিপদ তার চিন্তাকে আবিষ্ট করে ফেলে। এমন সময় আদর্শ কোন ব্যক্তি, সফল কোন উদাহরণ তাকে প্রেরণা যোগাতে পারে। ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ব্যবসায় নির্দেশনা’ বইয়ের লেখক এমনই একজন সফল উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ডক্টর সবুর খান একজন কিংবদন্তী ব্যবসায়ী। তথ্য-প্রযুক্তি খাতের একটি ব্যবসার মাধ্যমে তার কর্মজীবনের শুরু। এরপর মেধা, পরিশ্রম, দূরদর্শীতা আর দক্ষতা দিয়ে তিনি বর্তমানে দেশের একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী। তার নিজের অভিজ্ঞতা ও পথ পরিক্রমার নানান ঘাত প্রতিঘাতের আলোকে লেখা এ বই। শুধু নিজের কথাই নয়, এ বইয়ে তিনি সংযুক্ত করেছেন আরো ছয় জন সফল ব্যবসায়ীর জীবন কথা। বড় হওয়ার এসব গল্প নিঃসন্দেহে এ পথের নতুন যাত্রীদের জন্য অনুপ্রেরনা হবে, আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাবে।

এই বই পাঠ শেষে মনের ভিতরে একটি ধারণা খুব স্পষ্ট হয়। আর তা হলো যতটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সফল হতে হয়েছে লেখককে, তিনি চান না ব্যবসায় নেমে এতটা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ুক পরের প্রজন্ম। তাই তো নিজের চলার পথের নানান বাঁক পিতার স্নেহে সযতনে উজ্জ্বল রঙ্গে রাঙ্গিয়ে গেছেন তিনি। নতুনরা বিকশিত হোক, জীবনের স্বাদ বিস্বাদের গল্পগুলো সফল হয়ে উঠুক। লেখকের এই ইচ্ছা জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে এই বইয়ের প্রতিটি বাক্যে, বাক্যের গাঁথুনীতে।

সাজিদ রাজু

সিনিয়র রিপোর্টার ও নিউজ প্রেজেন্টার, সময় টেলিভিশন

সিলিকন ভ্যালির গুরু খ্যাত ‘পিটার থিয়েল’ রচিত ‘জিরো টু ওয়ান’ বইয়ের অনুবাদক

ফোন: ০১৯১১২১১২৬০

ই-মেইল: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.